১১ই এপ্রিল, ১৯৭০। ঠিক এই দিনে চাঁদের বুকে পা রাখার স্বপ্ন নিয়ে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছিল নাসার মহাকাশযান 'অ্যাপোলো ১৩' (Apollo 13)। কিন্তু তারা জানত না, মহাকাশের অন্ধকার বুকে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে যমদূত।
১. অভিযানের লক্ষ্য
এটি ছিল নাসার সপ্তম অ্যাপোলো মিশন এবং চাঁদে নামার কথা ছিল তৃতীয়বারের মতো। কমান্ডার জেমস লাভেল, জন সুইগার্ট এবং ফ্রেড হাইস—এই তিন সাহসী নভোচারী নিয়ে যানটি যাত্রা শুরু করেছিল। সব ঠিকঠাক থাকলে তারা চাঁদের 'ফ্রা মাউরো' (Fra Mauro) অঞ্চলে অবতরণ করতেন।
২. সেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ
যাত্রার প্রায় ৫৫ ঘণ্টা পর, পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ মাইল দূরে হঠাৎ একটি বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে মহাকাশযানটি। একটি অক্সিজেন ট্যাঙ্ক বিস্ফোরিত হয়। কন্ট্রোল রুমে নভোচারী জ্যাক সুইগার্ট সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন— "Houston, we've had a problem." (হিউস্টন, আমাদের একটি সমস্যা হয়েছে)।
মুহূর্তের মধ্যে কমান্ড মডিউলের অক্সিজেন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। চাঁদে নামার স্বপ্ন নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়, শুরু হয় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে পৃথিবীতে ফেরার এক কঠিন লড়াই।
৩. লুনার মডিউল যখন 'লাইফবোট'
মূল যানটি (Odyssey) অকেজো হয়ে যাওয়ায় নভোচারীরা লুনার মডিউলে (Aquarius) আশ্রয় নেন। এই মডিউলটি মূলত মাত্র দুজন মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু সেখানে তিনজন মানুষকে থাকতে হচ্ছিল। তীব্র শীত, অক্সিজেনের অভাব এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের বিষক্রিয়া—প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আতঙ্কের।
৪. অসম্ভবকে সম্ভব করার লড়াই
পৃথিবীতে বসে থাকা নাসার বিজ্ঞানীরা দিন-রাত এক করে হিসাব কষতে শুরু করেন। জ্বালানি বাঁচাতে মহাকাশযানের সব পাওয়ার বন্ধ করে দেওয়া হয়। নভোচারীরা হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় দিন কাটিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন, জাহাজটিকে সরাসরি পৃথিবীতে না এনে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে 'ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি'র মাধ্যমে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে।
৫. পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন
১৭ই এপ্রিল, ১৯৭০। সারা পৃথিবী যখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিল, তখন প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে অ্যাপোলো ১৩। যদিও তারা চাঁদে নামতে পারেননি, কিন্তু অসম্ভব প্রতিকূলতা জয় করে জীবিত ফিরে আসায় একে ইতিহাসের 'সফল ব্যর্থতা' (Successful Failure) বলা হয়।
আজকে আমাদের শিক্ষা
অ্যাপোলো ১৩ আমাদের শেখায় যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, শান্ত থেকে দলগতভাবে কাজ করলে এবং সঠিক বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে আসা সম্ভব।



0 Comments